২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ১০ অক্টোবর

0

নিজস্ব প্রতিবেদক :
ঢাকা : ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনার দ-বিধি (হত্যা) ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের দুই মামলায় আগামী ১০ অক্টোবর রায় ঘোষণার তারিখ ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
মামলাগুলোয় যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে মঙ্গলবার ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন রায় ঘোষণার এ তারিখ ঠিক করেন।
এদিকে রায়ের তারিখ ঘোষণার পর এদিন মামলাটিতে জামিনে থাকা বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ভাগ্নে লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউকসহ ৮ জনের জামিন বাতিল করে তাদেরকে কারাগারে পাঠিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
অন্যদিকে রায়ের তারিখ ঘোষণার পর রাষ্ট্রপক্ষ সকল আসামির সর্বোচ্চ শাস্তির আর্জি এবং আসামি পক্ষ আসামিদের বেকসুর খালাসের আর্জি জানিয়েছে।
এর আগে মঙ্গলবার পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের অস্থায়ী আদালতে বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে এ মামলায় যুক্তি উপস্থাপন শুরু হয়।
আসামি সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুসহ সকল আসামির পক্ষে অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান ল’ পয়েন্টে যুক্তি উপস্থাপন করেন। তিনি ১২টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত প্রচলিত আইন ও উচ্চ আদালতের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের আলোকে আসামিদের খালাসের পক্ষে তিনি তার যুক্তি উপস্থাপন করেন। যুক্তি উপস্থাপনের সমাপ্তিতে তিনি বলেন, ‘আমার আসামিরা খালাস পাবে বা সাজা হবে এ জন্য আমি এ মামলা পরিচালনা করি নাই। আমি এসেছিলাম ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় আদালতকে সহায়তা করতে। এখন আদালত বিবেচনা করবেন। আমি সেই ন্যায় বিচারের প্রত্যাশায় রইলাম।’
এরপর সিনিয়র আইনজীবী আব্দুর রেজ্জাক খান আসামি ডিউকের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনের জন্য দাঁড়ালে রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর সৈয়দ রেজাউর রহমান বাঁধা দিয়ে বলেন, ‘সোমবারই বলে দেওয়া হয়েছিল সকল আসামির পক্ষে ল’ পয়েন্টে যুক্তি উপস্থাপন করবেন অ্যাডভোকেট এসএম শাহজাহান। তিনি করেছেনও। এখন সময় নষ্ট করার বিষয়ে আদালত দয়া করে দেখবেন। তবে আদালত বাধা না দেওয়ায় রেজ্জাক খান যুক্তি উপস্থাপনে বলেন, ‘২০০৪ সালের ঘটনায় আসামির বিরুদ্ধে ৭ বছর পর একজন সাক্ষী মেজর জেনারেল সাদেক হাসান রুমি আসামি মাওলানা তাজউদ্দিনকে পাকিস্তান পাঠানোর বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন। ঘটনার সময় তিনি ডিজিএফআই-এর প্রধান ছিলেন। তিনি সব জানতেন। তিনি হলেন সাক্ষী, আর আমি আসামি। যারা তাজউদ্দিনকে বিমানে তুলে দিলেন তারাও সাক্ষী। এ মামলায় রায়ে চার্জের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদেরকে চার্জের বাইরের ধারায় নেওয়া চেষ্টা করছেন।’ ওই সময় তিনি উচ্চ আদালতের কিছু সিদ্ধান্ত দাখিল করে যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেন।
মাহবুব হোসেন বলেন, ‘আসামি হান্নানের স্বীকারোক্তি দিয়ে আমার আসামিকে (পিন্টু) সাজা দেওয়া যাবে না। কারণ, তার স্বীকারোক্তি অন্যান্য সাক্ষীর দ্বারা সমর্থিত হয়নি। আসামিদের দ্বারাও নয়। ১২ মাস কাস্টডিতে রাখার পর হান্নানের স্বীকারোক্তি রেকর্ড করা হয়েছে। তাই তা স্বেচ্ছাকৃতও নয়। আর একটি মামলায় একজন আসামির দুটি স্বীকারোক্তি আইন ও উচ্চ আদালতের আলোকে গ্রহণযোগ্যও নয়।’
ওই সময় প্রসিকিউটর মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, ‘এখানে ২টি স্বীকারোক্তি নেই। হান্নান পরে যেটি করেছে তা প্রথমটির ধারাবাহিকতা মাত্র।’ এরপর খন্দকার মাহবুব হোসেন সাজনীন হত্যা মামলার ২টি স্বীকারোক্তির বিষয়ে উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত তুলে ধরলে প্রসিকিউটর কাজল বলেন, ‘ওই ঘটনায় ২টি মামলা ছিল। তাই এই মামলার সঙ্গে মেলানো যাবে না।’
এরপর মাহবুব হোসেন বলেন, ‘এ মামলাটি রাজনীতিকরণ করা হয়েছে। যার কারণে প্রকৃত অপরাধীদের আজ বিচার হচ্ছে না। বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় শেখ হাসিনাকে এভাবে হত্যা করাতে যাবে কেন। যদি তাদের হত্যা করানোর ইচ্ছা থাকত তবে আরো অনেক পন্থা ছিল বলে তার যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেন।’
এ সময় প্রসিকিউটর রেজাউর রহমান বলেন, ‘আমরা আগেও বলেছি, এখনও বলছি, রাজনৈতিকভাবে কাউকে এই মামলায় আসামি করা হয়নি। এরপর এ প্রসিকিউটর জামিনে থাকা ৮ আসামির জামিন বাতিলের আবেদন করেন। ওই সময় আসামি পক্ষে জামিন বহাল রাখার পক্ষে শুনানিতে বলেন, ‘জামিন পাওয়ার পর আসামিরা জামিনের কোন শর্ত ভঙ্গ করেননি। উচ্চ আদালত থেকে তারা জামিন পেয়েছেন।’
উভয় পক্ষে শুনানি শেষে বিচারক বলেন, ‘দীর্ঘদিন বিচার কার্যশেষে আজ এ পর্যায়ে এসেছি। যা অপনাদের সকলের সহযোগিতায় সম্ভব হয়েছে। এতোদিন এক সঙ্গে থাকায় আপনারা আইনজীবী, আসামিসহ বিচার সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে অন্যরকম একটি সম্পর্ক তৈরি হয়েগেছে। মামলা পরিচলনায় সহায়তা করার জন্য আমি আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ। আমি চেষ্টা করেছি আইনের মধ্যে থেকে বিচার পরিচালনা করতে। আগামী ১০ অক্টোবর আমি মামলার রায় ঘোষণার দিন ঠিক করলাম। চুলচেরা বিশ্লেষণ করে বিচার করার মালিক আল্লাহ। আমার সেই ক্ষমতা নেই। আমি ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করব। আর জামিনে যারা রয়েছেন তাদের এই পর্যায়ে জামিনে রাখায় আইনগত অসুবিধা থাকায় তাদের জামিন বাতিল করা হইল।’
বিচারক রায় ঘোষণার দিন ঠিক করার পর প্রসিকিউর সৈয়দ রেজাউর রহমান ও মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, আমরা সন্দেহের ঊর্ধ্বে আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমান করতে পেরেছি। তাই সকল আসামির সর্বোচ্চ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রত্যাশা করছি।
অন্যদিকে আসামি পক্ষে অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, রেজ্জাক খান, এসএম শাহজাহান, নজরুল ইসলাম, তারা মিয়া, মাঈনুদ্দিন তাদের আসামিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ প্রদান করতে পারেন নাই মর্মে উল্লেখ করে আসামিরা খালাস পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন।
জামিন বাতিল হওয়া অপর ৭ আসামি হলেন, সাবেক আইজিপি মো. আশরাফুল হুদা, শহিদুল হক ও খোদা বক্স চৌধুরী এবং মামলাটির তিন তদন্ত কর্মকর্তা সাবেক বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, সিআইডির সিনিয়র এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান, এএসপি আব্দুর রশীদ ও সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুল ইসলাম।
উল্লেখ্য, প্রথম রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটিতে ২৫ কার্যদিবস পদ্ধতিগত বিষয়ের উপর যুক্তি উপস্থাপন করে। যা চলতি বছর ১ জানুয়ারি তা শেষ হয়। রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তি উপস্থাপনে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ৩৮ আসামির মৃত্যুদ- এবং ১১ সরকারি কর্মকর্তার ৭ বছর কারাদ-ের আর্জি জানান। এরপর আসামি পক্ষ একই বিষয়ের উপর ৮৭ কার্যদিবস যুক্তি উপস্থাপন করেন। যা গত ২৯ আগস্ট শেষ হয়। এরপর ২ কার্যদিবস ল’ পয়েন্টে আসামি পক্ষ যুক্তি উপস্থাপন করন। গত ৫ সেপ্টেম্বর থেকে রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর কাজল ল’ পয়েন্টে যুক্তি উপস্থাপন শুরু করে ৩ কার্যদিবসে শেষ করেন। এরপর গত ১২ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপক্ষে আরও ২ জন যুক্তি উপস্থাপনের পর প্রসিকিউটর রেজাউর রহমান শুরু করে সোমবার শেষ করেন। ওইদিন আসামি পক্ষ যুক্তি খন্ডন শুরু করে মঙ্গলবার শেষ করার পর বিচারক রায় ঘোষণার দিন ঠিক করলেন। প্রসিকিউশন সূত্র বলছে, মোট ১১৯ কার্যদিবস যুক্তি উপস্থাপন হয়েছে।
মামলায় মোট আসামি ৫২ জন। তবে তাদের মধ্যে বিচারকালীন আসামি জামায়াত নেতা আলী আহসান মুহাম্মাদ মুজাহিদের মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলায় এবং হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নান ও শরিফ শাহেদুল ইসলাম বিপুলের ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর উপর হামলার মামলায় মৃত্যুদ- কার্যকর হওয়ায় তাদের এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তাই বর্তমানে মামলা দুইটিতে মোট আসামি ৪৯ জন।
আসামিদের মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুসহ ২৩ জন কারাগারে রয়েছেন।
কারাগারে থাকা অপর ২১ আসামি হলেন, মুফতি হান্নানের ভাই মুহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে অভি, মাওলানা আবু সাইদ ওরফে ডাক্তার জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলুবুল, মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, শাহাদত উল্যাহ ওরফে জুয়েল, হোসাইন আহমেদ তামিম, মইনুদ্দিন শেখ ওরফে আবু জান্দাল, আরিফ হাসান সুমন, মো রফিকুল ইসলাম সবুজ, মোঃ উজ্জল ওরফে রতন, হরকাতুল জিহাদ নেতা আব্দুল মালেক ওরফে গোলাম মোহাম্মাদ ওরফে জিএম, শেখ আব্দুস সালাম, কাশ্মিরী নাগরিক আব্দুল মাজেদ ভাট, আব্দুল হান্নান ওরফে সাব্বির, মাওলানা আব্দুর রউফ ওরফে পীর সাহেব, মাওলানা শাওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই এর সাবেক মহাপরিচালক আবদুর রহিম ও রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী।
মামলায় বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, বিএনপি নেতা কাজী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন কায়কোবাদ, সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিনসহ ১৮ জন আসামি পলাতক রয়েছেন।
পলাতক অপর ১৪ জন হলেন মহিবুল মুত্তাকিন ওরফে মুত্তকিন, আনিসুল মুরছালিন ওরফে মুরছালিন, মো. খলিল, জাহাঙ্গীর আলম বদর, মোঃ ইকবাল, লিটন ওরফে মাওলানা লিটন, সবেক ডিসি পূর্ব মো. ওবায়দুর রহমান, সাবেক ডিসি দক্ষিণ খান সাইদ হাসান, লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ারদার ও মেজর (অব.) এটিএম আমিন, হানিফ এন্টার প্রাইজের মালিক মো. হানিফ, শফিকুর রহমান, আব্দুল হাই ও বাবু ওরফে বাতুল বাবু।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের জনসভায় সন্ত্রাসীরা ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালায়। হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা ও প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নির্মমভাবে নিহত হন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রানে বেঁচে যান। আহত হন শতাধিত নেতাকর্মী। এ ঘটনায় মতিঝিল থানার উপপরিদর্শক ফারুক হোসেন, আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল জলিল ও সাবের হোসেন চৌধুরী বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় পৃথক ৩টি এজাহার দায়ের করেন।

Share.

About Author

Leave A Reply