২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় আজ

0

নিজস্ব প্রতিবেদক :
ঢাকা: দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে আজ। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ঘটনায় করা মামলায় ১৪ বছর পর আজ ঘোষণা করা হবে রায়।
পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডে পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারসংলগ্ন অস্থায়ী এজলাসে ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচারক শাহেদ নূরউদ্দিন এ রায় ঘোষণা করবেন। গত ১৮ সেপ্টেম্বর যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে একই বিচারক রায় ঘোষণার এ তারিখ ঠিক করেন।
১৪ বছরের মধ্যে দুই দফায় তদন্তে ৬ বছর, আর অবশিষ্ট ৮ বছরের মধ্যে ১৭৫৪ কার্যদিবস চলে মামলা দুটির বিচারকাজ। রাষ্ট্রপক্ষ সব আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি এবং আসামিপক্ষ খালাসের দাবি করেছে। দুই মামলায় মোট আসামি ছিল ৫২ জন। ৩ জনের মৃত্যুদ- হওয়ায় এখন আসামি ৪৯ জন।
রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, আমরা আসামিদের স্বীকারোক্তি, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিক ও ডকুমেন্টারি সাক্ষীর মাধ্যমে সব আসামির বিরুদ্ধে সন্দেহের ঊর্ধ্বে অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। আশা করছি ট্রাইব্যুনাল আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করবেন। রাষ্ট্রপক্ষের অপর আইনজীবী মোশারফ হোসেন কাজল বলেন, রাষ্ট্রীয় মদদে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা হয়েছিল। একটি চেইন অব কমান্ডের নির্দেশে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আগে ও পরে কাজ করেছে আসামিরা। সেই হিসাবে সবাই সমান অপরাধী। তাই সব আসামির মুত্যুদন্ডের শাস্তি প্রত্যাশা করছি।
মামলার অন্যতম আসামি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার স্টেট ডিফেন্স ল ইয়ার বা রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী আবুল কালাম মো. আক্তার হোসেন তার মক্কেলের কী রায় প্রত্যাশা করেন এমন প্রশ্নে কোনো মন্তব্য থেকে বিরত থেকেছেন।
আরেক আসামি বিএনপি জোট সরকারের আমলের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর। তার আইনজীবী মো. নজরুল ইসলাম বলেন, মুফতি হান্নানের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে বাবর সাহেবকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় আরও ১২ আসামি স্বীকারোক্তি দিলেও তাতে বাবর সাহেবের নাম বলেননি। শুধু মুফতি হান্নানের প্রশ্নবিদ্ধ স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে বাবর সাহেবকে দ- দেওয়া ঠিক হবে না।
খালেদা জিয়ার ভাগ্নে লে. কমান্ডার (অব) সাইফুল ইসলাম ডিউকের আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, আমরা মনে করি মুফতি হান্নানের দ্বিতীয় স্বীকারোক্তি দিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ দলটির যেসব নেতাকে আসামি করা হয়েছে, রাষ্ট্রপক্ষ তাদের কারো বিরুদ্ধেই অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। আমার বিশ্বাস, তারা সবাই খালাস পাবেন।
সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর আইনজীবী রফিকুল ইসলাম তারা মিয়া বলেন, তার মক্কেলের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। তাই তিনি মনে করেন, তার মক্কেল খালাস পাবেন।
মামলার আসামি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় প্রথমে একটি মামলা হলেও চার্জশিট হয় ২টি। একটি বিস্ফোরক আইনে, অন্যটি দ-বিধি আইনে। দুই চার্জশিট মিলিয়ে মোট আসামি ছিল ৫২ জন। তাদের মধ্যে অন্য মামলায় তিন আসামির ইতোমধ্যেই মৃত্যুদ- কার্যকর হয়েছে। এ জন্য এ তিনজনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেন ট্রাইব্যুনাল। বর্তমানে মোট আসামি ৪৯ জন, যারা প্রত্যেকেই দ-বিধি (হত্যা) মামলার আসামি। তাদের মধ্যে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় আসামি ৩৮ জন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদ-াদেশ পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ। হরকাতুল জিহাদের নেতা মুফতি হান্নান এবং শরিফ শাহেদুল ইসলাম বিপুল ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর হামলার মামলায় মৃত্যুদ-াদেশ পেয়েছেন। তাদের তিনজনের রায়ও কার্যকর হয়েছে।
আসামিরা কে কোথায়
৪৯ আসামির মধ্যে ৩১ জন কারাগারে এবং ১৮ জন পলাতক। কারাবন্দিদের মধ্যে ৮ জন জামিনে ছিলেন। গত ১৮ সেপ্টেম্বর রায়ের তারিখ ধার্য হওয়ার পর ট্রাইব্যুনাল তাদের জামিন বাতিল করে কারাগারে প্রেরণ করেন। তারা হলেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার আমলের তিন আইজিপি মো. আশরাফুল হুদা, শহুদুল হক ও খোদা বক্স চৌধুরী; তৎকালে মামলাটির তদন্তকারী তিন তদন্ত কর্মকর্তা সাবেক বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, সিআইডির সিনিয়র এএসপি মুন্সী আতিকুর রহমান, এএসপি আবদুুর রশীদ, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ভাগ্নে লে. কমান্ডার (অব) সাইফুল ইসলাম ডিউক এবং সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুল ইসলাম।
কারাবন্দি অন্য ২৩ আসামি হলেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার আমলে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআইয়ের মহাপরিচালক আবদুর রহিম ও রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী; লুৎফুজ্জামান বাবর, আবদুস সালাম পিন্টু, মুফতি হান্নানের ভাই মুহিবুল্লাহ মফিজুর রহমান ওরফে অভি, মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডাক্তার জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, মো. জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, শাহাদতউল্লাহ ওরফে জুয়েল, হোসাইন আহমেদ তামিম, মইনউদ্দিন শেখ ওরফে আবু জান্দাল, আরিফ হাসান সুমন, মো. রফিকুল ইসলাম সবুজ, মো. উজ্জল ওরফে রতন, হরকাতুল জিহাদ নেতা আবদুুল মালেক ওরফে গোলাম মোহাম্মাদ ওরফে জিএম, শেখ আবদুস সালাম, আবদুল হান্নান ওরফে সাব্বির, মাওলানা আবদুর রউফ ওরফে পীর সাহেব, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া এবং কাশ্মীরের নাগরিক আবদুল মাজেদ ভাট।
পলাতক ১৮ আসামি হলেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, বিএনপিদলীয় সাবেক এমপি কাজী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন কায়কোবাদ, হানিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. হানিফ, মুফতি আবদুল হাই, মুফতি শফিকুর রহমান, আবদুস সালাম পিন্টুর দুই ভাই বাবু ওরফে রাতুল বাবু ও মাওলানা মো. তাজউদ্দিন, মহিবুল মুত্তাকিন ওরফে মুত্তাকিন, আনিসুল মুরসালিন ওরফে মুরসালিন, মো. খলিল, জাহাঙ্গীর আলম বদর, মো. ইকবাল, লিটন ওরফে মাও. লিটন ওরফে দোলোয়ার হোসেন ওরফে জোবায়ের, পুলিশের সাবেক ডিসি (পূর্ব) মো. ওবায়দুর রহমান, ডিসি (দক্ষিণ) খান সাঈদ হাসান, লে. কর্নেল (অব) সাইফুল ইসলাম জোয়ারদার ও মেজর (অব) এটিএম আমিন।
এদিকে রায়কে কেন্দ্র করে সরকার ও বিএনপি এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে। পুলিশ প্রশাসনও কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এ রায়কে ঘিরে সারাদেশে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে পুলিশ।
এই হামলার বিএনপিকে দায়ী করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মাস্টারমাইন্ড হলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। অন্যদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এই মামলায় তারেক রহমানকে পরিকল্পিতভাবে জড়ানো হয়েছে।

Share.

About Author

Leave A Reply