‘হেফাজতে নির্যাতনের মানসিকতা সরকারের নেই’

0

সবুজবাংলা ডেস্ক : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে কোন ধরনের নির্যাতনের মানসিকতা তাঁর সরকারের নেই এবং সরকার এ ধরনের কাজ করে না।
তিনি বলেন, ‘সত্যিকথা বলতে কি, এ ধরনের কোন মানসিকতা আমাদের নেই এবং আমরা সেটা করিও না।’ লন্ডন সফররত প্রধানমন্ত্রী মঙ্গলবার বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে একথা বলেন।
বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের সিনিয়র সাংবাদিক মানসী বড়ুয়া এই সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, গণতন্ত্র এবং ঋণ খেলাপি হওয়ার সংস্কৃতি সম্পর্কেও কথা বলেন।
মানসী বড়ুয়া বলেন, বাংলাদেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতনের ইতিহাস অনেক দিনের। এটি কোন বিশেষ সরকারের আমলে যে ঘটেছে তা নয়। কিন্তু বর্তমান সরকার এ ধরনের নির্যাতন বন্ধে কি ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে?
উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ঘটনাচক্রে কিছু (দু-একটি) ঘটনা ঘটতে পারে। বরং আপনি যদি গত ১০ বছরে আমাদের অবস্থানটা দেখেন- আমরা কিন্তু অপরাধ নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পেরেছি।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আপনি আমার নিজের কথাটাই চিন্তা করেন- যখন আমি আমার বাবা-মা-ভাইদের সব হারালাম, খুনীদের বিচার না করে ইনডেমনিটি দেওয়া হলো, অর্থাৎ আপনি অপরাধকে প্রশ্রয় দিলেন।’
তিনি বলেন, ‘যে দেশে অপরাধকে স্বীকৃতি দিয়েই একটা সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয় সেই দেশে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে যায়।’
‘তবে আমরা যেকোন অপরাধের জন্য কঠোর আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা নিয়েছি। এখন ঐভাবে কখনই হেফাজতে মৃত্যু হয় না বা নির্যাতনও যে খুব একটা করা হয়, তাও নয়,’ যোগ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে অপরাধীদের থেকে তথ্য সংগ্রহের যে কতগুলো নিয়ম রয়েছে-সেজন্য আমরা আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে নিয়ে আসি। তারা এজন্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বহুদেশে থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে।
তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক স্বীকৃত পদ্ধতিতেই অপরাধীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এর বাইরে কোন কিছুই করা হয় না, এটা হলো বাস্তবতা।’
শেখ হাসিনা বলেন, দেশ স্বাধীন হবার সাড়ে তিন বছরের মধ্যেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হলো। এই কালচারটাই চলে এলো, এটাই প্রচলিত হলো।
তিনি বলেন, ‘সে সময় দেশে সামরিক শাসন বলবৎ ছিল (কখনও সরাসরি আবার কখনও নাম পরিবর্তন করে) যেখানে ক্ষমতাটা ক্যান্টনমেন্টের ভেতরেই ছিল।’
‘সেখান থেকে ফিরিয়ে নিয়ে এসে দেশকে একটু সুষ্ঠু ধারায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা একটা কঠিন দায়িত্ব, এই কঠিন দায়িত্বটা আমরা পালন করে যাচ্ছি,’ বলেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘কাজেই এখন যারা সমালোচনা করছে তাদেরকে যদি আপনারা সুনির্দিষ্টভাবে জিজ্ঞাসা করেন, তাহলে, আমার মনে হয়, এ সম্পর্কে তারা খুব বেশি তথ্য দিতে পারবে না।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি জানি, জেনেভাতে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং আমাদের আইন মন্ত্রীও সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং অন্যান্য প্রতিনিধিও সেখানে ছিলেন এবং এর যথাযথ উত্তর তারা দিয়ে এসেছেন।’
উল্লেখ্য, ৩০ ও ৩১ জুলাই জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির (কমিটি এগেইনস্ট টর্চার-ক্যাট) কাউন্সিলে বাংলাদেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন এবং অন্যান্য অমানবিক আচরণ বন্ধে বাংলাদেশের সরকার কি ব্যবস্থা নিয়েছে সে সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছিল।
মানসি বড়ুয়া বলেন, অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বাংলাদেশ এখন খুবই ভালো করছে। গত বছর অন্যতম দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশের তালিকায় বাংলাদেশ ছিল। এ প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে কি পৌঁছুচ্ছে?
শেখ হাসিনা বলেন, ‘অবশ্যই’। তিনি বলেন, ‘একটু চিন্তা করেন ২০০৫-০৬ সালে যেখানে আমাদের দারিদ্রের হার ৪১ শতাংশ ছিল সেখানে আজকে সেটা কমে ২১ দশমিক ৪ ভাগে নেমে এসেছে। গত ১০ বছরের মধ্যে আমরা এটা অর্জন করতে পেরেছি। মানুষের মাথাপিছু আয় যেটা মাত্র ৪শ’/৫শ’ মার্কিন ডলার ছিল আজকে সেখানে ২০০০ ডলারের কাছাকাছি আমরা পৌঁছে যাচ্ছি। প্রবৃদ্ধি এখন ৮ দশমিক ১ ভাগ অর্জন করতে পেরেছি।’
তিনি বলেন, ‘উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলে স্বভাবিকভাবেই মূল্যস্ফীতি বাড়ে, সেখানে আমরা কিন্তু মূল্যস্ফীতি বাড়তে দেইনি। আমরা কিন্তু তা ৫ দশমিক ৫ বা ৬’র মধ্যেই ধরে রেখেছি।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘খুব স্বাভাবিকভাবে এর সুফল কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছেই পৌঁছায়।’
অপর এক প্রশ্নের উত্তরে দেশে বিদ্যমান খেলাপি ঋণের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যতোটা প্রচার হয় বিষয়টা কিন্তু ততোটা নয়।’ তিনি বলেন, ‘আমি নিজেও আসার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং ব্যাংকের সচিবের সাথে সভা করেছি। ঋণ নিয়ে না দেয়ার প্রবণতা, এই কালচারটা আমাদের দেশে শুরু হয় সামরিক শাসকদের শাসনামলে। আমরা যখনই সরকারে এসেছি তখনই চেষ্টা করেছি তাদের (খেলাপি) কাছ থেকে টাকাটা আদায় করার।’
বাংলাদেশে গণতন্ত্রের মান সম্পর্কিত এক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেখুন আমাদের দেশে আমি সরকারে আসার আগে অর্থাৎ ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আসার আগে ’৭৫ এর পর থেকে বাংলাদেশে একটিমাত্র টেলিভিশন চ্যানেল ছিল, সেটাও সরকারি- বিটিভি। একটামাত্র রেডিও। আর কয়েকটি সংবাদপত্র এবং কিছু সরকারি সংবাদপত্র। তিনি বলেন, ‘আমি এসে সব উন্মুক্ত করে দিলাম বেসরকারি খাতে। এখন ৪৪টি টেলিভিশন। অবশ্য আমার উদ্দেশ্য ছিল অন্যরকম। আমার উদ্দেশ্য ছিল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।’
মানষি বড়ুয়া জানতে চান- এ সকল সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা বর্তমানে কতটুকু রয়েছে?
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গণমাধ্যমের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা বিদ্যমান রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতা যদি না থাকতো তাহলে সত্য মিথ্যার মিশ্রণে সরকারের বিরুদ্ধে এত অপপ্রচার তারা কিভাবে করছে আমাকে বলেন।’
শেখ হাসিনা বলেন, যখন সামরিক স্বৈরশাসকেরা ক্ষমতায় ছিলো- এরশাদের আমলে বা জিয়ার আমলে বলেন, এমনকি খালেদা জিয়ার আমলে- এই স্বাধীনতা কি কেউ ভোগ করেছে। সাংবাদিকদের ওপর কি অত্যাচারটা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সবাই সব কথা বলে, তারপর বলে স্বাধীনতা নাই। তাহলে স্বাধীনতা না থাকলে এত কথা বলল কিভাবে?’
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম জানান, ‘যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে চলমান মেডিকেল চিকিৎসা শেষে (চোখের) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী বৃহস্পতিবার দেশে ফিরবেন। তিনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এবং রাষ্ট্রদূতদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ‘দূত সম্মেলনে’ যোগদান এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে গত ১৯ জুলাই লন্ডন পৌঁছেন। তথ্যসূত্র : বাসস

Share.

About Author

Leave A Reply